জীবনে কখনো কখনো কিছু সময় আসে যখন 'কেন যেনো কিছুই ভালো লাগছে না'- এমন অনুভুতি হয়৷ বয়ঃসন্ধিকালে যখন এমন হতো, তখন এটার কারণ উদ্ঘাটন করতে গিয়ে বইপত্র ঘেঁটে নিজেকে বুঝ দিয়েছিলাম যে এখন আসলে শরীর-মনে পরিবর্তন আসছে তাই একটু মন খারাপ বা উদাসী ভাব আসতেই পারে৷
![]() |
'কাজে মন না বসলে' ইসলামের আলোকে করণীয় |
কিন্তু সমস্যার সমাধান তখন হয়নি। বরং সময়ের সাথে সাথে প্রকট হয়েছিলো৷ যখন আরেকটু বড় হলাম, জীবনটাকে সুতোকাটা ঘুড়ির মতোপ মনে হতে লাগলো। 'কী যেনো নেই', 'কেন যেন কিছুই ভাল লাগছে না'- এমন অনুভূতিগুলো তখন আরো বেড়ে গিয়েছিলো৷ আশেপাশের সমবয়সীদের দেখে বুঝতে পারতাম, এমন অনুভূতিকে খুব কমই ওরা আলাদা করে ধরতে পারতো। কিন্তু পালিয়ে বাঁচতে খেলাধুলা, গেমস, সিনেমা দেখার মতো অর্থহীন সময় নষ্টের কাজের মাঝেই 'বিনোদন' খুঁজে নিতো, তবে কখনোই অন্তরের শূণ্যতা দূর করতে পারত না কেউ৷ মনের সাথে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বোঝাপড়া করার সাহসটাই বেশিরভাগ মানুষের থাকে না। মনকে তখন 'চিন্তা এড়িয়ে' যেতে দেয় সবাই৷ সমস্যার সমাধান তখন আর হয় না৷
সমাধান নিয়ে ভেবেছিলাম তখনও৷ এরপর যখন মাদরাসায় ধাপে ধাপে নিচের ক্লাসগুলো পাড়ি দিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে পদার্পণ করলাম, কুরআনের অর্থ তখন বুঝতে শিখেছি, এবং পাশাপাশি বিভিন্ন দরসে উস্তাদদের বেশ কিছু আলোচনা আর বই আল্লাহ সামনে এনে দিয়েছেন যা থেকে জেনেছি, মূল সমাধান আসলে খুবই সরল- জীবনের কেন্দ্রে আল্লাহকে নিয়ে আসা, প্রতিটা কাজেই আল্লাহর সন্তুষ্টি খোঁজা৷
যখন ছোট ছোট কাজেও আমরা আল্লাহর সাহায্য চাই এবং তা করে আল্লাহকে খুশি করতে চাই তখন তা সহজ করে দেন আল্লাহ৷ কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা সবসময় চাই না, ভুলে যাই বা বিষয়টিতে আনন্দ পাই না বলে আগ্রহ একই রকম থাকে না সবসময়৷ আমাদের মন খুবই পরিবর্তনশীল। দু'আ করা উচিত- "ইয়া মুক্বাল্লিবাল কুলুব, সাব্বিত কুলুবানা 'আলা দ্বীনিক"৷ অর্থঃ "অন্তর সমুহের পরিবর্তনকারী হে দয়াময় আল্লাহ, আমাদের অন্তরগুলোকে আপনার দ্বীনের উপর সুদৃঢ় করে দিন।"
আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকে কেন্দ্রে রেখে জীবনের কাজগুলো করতে চাইলে কিছু কাজ করতে হবে, কিছু চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
প্রথমত, জানা দরকার যে এমনটা হবেই। দুনিয়াতে কখনো অন্তর পূর্ণ হবে না, শূণ্যতা থাকবেই৷ কেবলমাত্র যেদিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার সাক্ষাত লাভ করবে রূহ, সেদিন আমরা প্রশান্ত হব, পূর্ণ শান্তি সেদিন আমাদের অর্জিত হবে৷
দ্বিতীয়ত, অন্তরকে সঠিক ও সরল পথে স্থির রাখতে কিছু ছোট কার্যকরী আমল করা যেতে পারে-
১. অনর্থক কথা বলা, অন্যের গীবত করায় কোনো কল্যাণ নেই৷ উপরন্তু আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল সা. কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। তাই এইসকল অর্থহীন আলোচনা, গীবত-শেকায়েত-পরনিন্দা এড়িয়ে চলা উচিত৷ কল্যাণকর কথা বলা, সম্ভব হলে জ্ঞানী ও দ্বীনি বন্ধু বা ভাইদের সান্নিধ্য খোঁজা৷ না থাকলে নির্জনতায় জ্ঞানার্জনের জন্য ভালো কোনো বইকে সঙ্গী করা৷
২. সবসময় অযুর অবস্থায় থাকা৷ একবার অযু ভেঙ্গে গেলে, আবার অযু করা। এতে পবিত্র ভাব থাকে, শরীর-মন চনমনে থাকে, ইবাদাতের প্রতি একটা স্বতঃস্ফূর্ত আকাঙ্ক্ষা আসে৷
৩. সুন্দর, পরিচ্ছন্ন পোশাক পরা, নিজেকেও পরিপাটি করে রাখা৷ নিজের 'ড্রেস-আপ এবং টার্ন-আউট' অনেক প্রভাব ফেলে হৃদয় ও মানসিকতায়৷ পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা তো আমাদের ঈমানেরও অঙ্গ।
৪. গান না শোনা। একজন দ্বীনদার মুসলিম বাদ্যযন্ত্র সহকারে তৈরি হওয়া প্রচলিত নষ্টধারার গান শুনবে না- এটাই স্বাভাবিক৷ কিন্তু তবুও কখনো এমন ভুল যেনো না হয়ে যায়। গানের কথাগুলো বেশিরভাগই প্রেম-বিরহ, দুঃখবিলাস এবং শিরক নিয়ে হয়ে থাকে। যা শোনার দ্বারা ধীরে ধীরে পথচ্যুত হওয়ার আশংকা আছে৷ অন্তত এতটুকু তো হয়-ই যে, এসব গান হৃদয়ে গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করে দেয়৷ এবং এই শূন্যতা মনের অস্থিরতা, ভালো না লাগা বা উদাসী অবস্থাকে আরো প্রকট করে ক্ষতিগ্রস্ত হবার মতো কোন পথে নিয়ে যায়। ইবাদতের প্রতি আগ্রহ ও ভালোবাসাকে কমিয়ে ফেলে।
পবিত্র কালামুল্লাহ শরিফে এবং প্রিয় নবীর হাদিসেও এ সকল গান-বাদ্য সম্পর্কে গভীর ক্ষতি ও স্পষ্টতই কঠিন নিষেধাজ্ঞা বর্ণিত আছে।
৫. কুরআন তিলাওয়াত করা। অর্থ না বুঝে হলেও শুধু কুরআনুল কারিমের পরম স্নিগ্ধ শান্তিময় আয়াতে কারিমাহগুলোর শাব্দিক তিলাওয়াতও অন্তরকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে ও প্রশান্ত করে দেয়৷ যেকোনো অশান্তিকে দূর করে দেয়৷ জীবনের প্রকৃত লক্ষ্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়৷ আল্লাহর কালামের এই এক অনন্য মহা গুণ, সুবহানাল্লাহ!
আর যদি অর্থ বুঝে পড়া যায় এবং অনুভব করার মতো করে হৃদয়টাকে যদি উপযুক্ত করা যায়, তাহলে তো বলার অপেক্ষা রাখে না কতটা মধুময় এ কুরআন, কতটা প্রশান্তিময়! আমাদের প্রিয় রব বলেছেন, "জেনে রাখো! আল্লাহর স্মরণেই অন্তর সমুহ প্রশান্ত হয়"। (সূরা রাআদ, আয়াত : ২৮)
৬. নামায আদায় করাঃ কিছুই ভাল না লাগার সময়ে বা প্রচণ্ড দুঃখময় কঠিন সময়েও যদি চোখের পানিগুলোকে অযুর পানি দিয়ে ধুয়ে নিয়ে দুই রাকা'আত নামায আদায় করা যায়, মনে অনন্য প্রশান্তি ও স্থিরতা ফিরে আসে৷ নামাযের সিজদার সময় বান্দা আল্লাহর সবচাইতে নিকটবর্তী থাকে৷ এই একান্ত সময়টাতে যদি প্রিয়তম রবের সমীপে ভালো না লাগার জানা-অজানা সব কারণগুলোকে চোখের পানিতে ঝরিয়ে দেওয়া যায়, অন্তর প্রশান্ত হবেই ইনশাআল্লাহ৷ মুসলিম হিসেবে সালাত আমাদের হৃদয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দিবে- এটা আমাদের সাথে প্রিয়তম আল্লাহর প্রতিশ্রুতি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, মনে রাখতে হবে কোনো অবস্থাতেই বিষণ্নতাকে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না৷ দুঃখ বিলাসী হওয়া যাবে না। মনটাকে সবসময় কাজ দিতে হবে৷ ভালো লাগা পছন্দের যেকোনো ভালো ও কল্যাণকর কাজ- যত ছোটই হোক তা করা উচিত, এতে মন প্রফুল্ল থাকে৷ যেকোনো নেতিবাচক চিন্তা আমাদের সৃষ্টিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, সম্ভাবনাকে নষ্ট করে, ঈমানকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে৷ ইতিবাচক চিন্তা করতে হবে, সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতে হবে৷ চার পাশের বিভিন্ন বিষয় থেকে এমন কি 'দেখতে ইচ্ছা করে না' মানুষটা থেকেও ভালো এবং সুন্দরটুকু খুঁজে নিতে হবে, মন্দটুকু নিয়ে চিন্তা ও আলাপ করা অশান্তি আর ক্ষতি ছাড়া কিছুই বয়ে আনে না৷
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আমাদেরকে প্রচেষ্টাগুলোকে কবুল করুন, আমাদেরকে 'নাফসে মুতমাইন্নাহ' বা প্রশান্ত আত্মাকে ধারণ করার তাওফিক দান করুন এবং আমাদেরকে জান্নাতুল ফিরদাউসের পথে পরিচালিত করুন। আমীন।